ত্রিপুরা ফোকাস

আমার মহালয়া, আমার তর্পন

শ্যামল ভট্টাচার্য

আমার মহালয়া, আমার তর্পন

হয়তো আগের দিনই প্রচণ্ড বৃষ্টি হয়ে গেছে আকাশ কালো করে, ঢল। নবনির্মীয়মান ফ্লাইওভার অধ্যুষিত রাজধানী শহরের একপ্রান্ত কাদায় থই থই। পরদিন সকালে দুর্যোগের স্মৃতি ভুলিয়ে দিতে চেয়ে মিষ্টি রোদ ওঠে। ঘরের মেঝে কিম্বা দেওয়ালে রোদের টুকরো নানা আকারে দেদীপ্যমান। কারও বুঝতে বাকি থাকে না, প্রকৃতি তার আঙুল দিয়ে আলপনা এঁকেছে রোদের। আশ্বিন তো বেশ কিছুদিন আগেই এসে গেছে। বিশ্বকর্মা পুজোর আগে থেকেই এখনও সবুজের বৈচিত্রে রাজ্যের সমতল অঞ্চলগুলিতে, গোমতি, হাওড়া, ফেনি, দেওনদীর তীরে তীরে কাশবনের অলঙ্কার দেখে অনুভব করা যায়, কোথাও যেন প্রকৃতিরও পুজো শুরু করার তোড়জোড় চলছে। যার চোখ আছে সে দেখতে পায়, অন্যরা ঘ্রাণে টের পায়, বোধে জলতরঙ্গ বাজে। বাংলায় যাকে বলে আলপনা, তা মানবিক হওয়ার অনেক আগে থেকেই নৈসর্গিক। জীবনানন্দ যেমন লিখেছিলেন, ‘আকাশ ছড়ায়ে আছে নীল হয়ে আকশে আকশে’, নীলের এই আলপনা কিন্তু ষোলআনা নৈসর্গিক। মহালয়া আগে আমার অনুভবে প্রতিবছর সেই নিসর্গকে জাগিয়ে তুলতো নতুন উদ্দীপনায়, আ আজকাল হয়ে উঠি স্মৃতিমেদুর।

 

রেডিও নামক যে যন্ত্রটিকে আজকাল অধিকাংশ মানুষ সারাবছর প্রায় ভুলে থাকি সেটি যে আমাদের সংস্কৃতির কতটা গভীরে তা অনুভব করা যায় মহালয়ার আগের দিন। স্মৃতিমেদুর আবার কখনও ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে মন। আমার বাবা কোনও ধর্মীয় আচরণ করতেন না। তিনি বলতেন, আমি জাতিতে স্বাস্থ্যকর্মী, মানুষের সেবা আমার ধর্ম ! কিন্তু বছরে এই একটা দিন শেষরাতে উঠে রেডিও শুনতেন, শোনাতেন। ১৯৩০ থেকেই অরল ইন্ডিয়া রেডিওর ( পরে আকাশবাণী) এই অনুষ্ঠান জাতিধর্মনির্বিশেষে বাঙালির প্রাণের অনুষ্ঠান। আমার বাবামাও সেই শ্রোতাদের উত্তরাধিকার আমাদের দিয়ে গেছেন। ভোর হতেই মা এক অঞ্জলি শিউলি এনে সাজিয়ে দিতেন রেডিওর টেবিলটা, গুনগুন করে গাইতেন। বানীকুমার রচিত ‘মহিষাসুর মর্দ্দিনী’ গীতিনাটক, পঙ্কজ মল্লিকের সুর আর বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের উদাত্ত কন্ঠ শুনে জেগে উঠতো আমাদের হাসপাতাল কোয়ার্টার, ‘বাজলো তোমার আলোর বেনু’ শুনে থিরথির কাঁপত  চাম্পাখাম্পা বেড়া দেওয়া সামনের ঘরের ধাড়ির সিলিঙের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে অনেকটা ব্যাডমিন্টন নেটের মতো দেখতে সরু জালের রেডিও অ্যান্টেনা। আলো আসতো ঘরে। সিমেন্টের মেঝে কিম্বা চাম্পাখাম্পা দেওয়ালে হাল্কা রোদের টুকরো নানা আকারে দেদীপ্যমান।বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের উদাত্ত উচ্চারণের সঙ্গে দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, পঙ্কজ মল্লিক, প্রতিমা বন্দোপাধ্যায়,সুমিত্রা সেন, তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, বিমল ভূষণ, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, অসীমা ভট্টাচার্য, শিপ্রা বসু, উতপলা সেন, সুপ্রীতি ঘোষও আরতি মুখোপাধ্যায়ের যুগলবন্দীআর শ্রেষ্ঠবাজিয়েদের অনুপম সহবত দুই ঘন্টা ধরে এক অদ্ভুত মূর্ছনায় ডুবিয়ে রাখতো সব্বাইকে, আজও রাখে।

আমার শৈশবের যতনবাড়ি, এমনকি পরিণত শৈশব কিম্বা কৈশোরের নরসিংগড়ে বিদ্যুতের আলো থাকলেও কোয়ার্টারের অদূরে যে আম জাম কাঁঠাল কৃষ্ণচূড়া রাধাচূড়া বেল কুল কড়ুই জারুল জলপাই আমড়া গামাই ভুয়াশ গরান আগরের বন ছিল, করবী জুই রজনীগন্ধা শেফালির বাগান আর রিফিউজিলতার ঝোপ ছিল,সন্ধ্যানামারপর সব কালো হয়ে যেত। ক্রমশ আকাশে এত তারা – কোথাও ফাঁকা নেই। এরই মধ্যে ছায়ার মতন বাদুড় উড়ে যেত। প্যাঁচা শিকারে বেরুলে তার ডাক আর ডানার ঝটাপটি শুনতে পেতাম। দিনের বেলায় আমরা সেসব গাছের তলায় তলায় হাঁটতাম, ফলফুলের খোঁজখবর নিতাম, অন্ধকারেও কি যেতাম না? ধুপ করে একটা পাকা আম পড়লো তো বড় ডাক্তারবাবুর ছেলে সচ্চিদানন্দ, কিম্বা ওয়ার্ডবয় সুরেন্দ্রকাকুর ছেলে হাবুল বাবুল আমি ও আমার ভাই সুভাষ – যে আগে শুনতে পেত সেইই টর্চহাতে ঠিক খুঁজে আনতো আমটাকে। ওই প্রায় গৃহপালিত গাছেদের রাতে, বৃষ্টির মধ্যে, কিম্বা দাঁতিলাগানো শীতে অচেনা প্রাণীর মতন লাগতো। স্কুলের বইয়ে গাছেদের প্রাণ থাকার কথা পড়ার অনেক আগে থেকেই প্রকৃতিপাঠ আমাদের শিখিয়েছিল জীব তিন প্রকার – মানুষ, পশু আর গাছ। গাছেরা সবচাইতে সুন্দর বসন্তের দুপুরে, ওদের কোনও ভয়ডর নেই। আশ্রিত প্রাণীদের নিঃসন্দেহে প্রশ্রয় দেয়। এমনকি ঠাণ্ডা সাপেরা গা বেয়ে উঠে কোটরে কোটরে উঁকি মারতে থাকলে গাছেরা নীরবে মুচকি মুচকি হাসে।

একবার মহালয়ার বিকেলে বড়পুকুরের পাড় ধরে শর্টকাটে আমার ক্লাসমেট শংকরের বাড়ির পথে গাছেদের মগডালে সূর্যাস্তের রোদ্দুর পড়ছিল- বড় বিমর্ষ লাগছিল তাদের। ততদিনে মহালয়ার সঙ্গে আত্মাদের সম্পর্কের কথা জেনে গেছি। সেদিন আমার বাবা আর ডাক্তার লাহা ছাড়া প্রায় প্রত্যেকের বাবা বড়পুকুরে তর্পন সেরেছেন। কেউকেউছয়জন পূর্বপুরুষকে পিণ্ড দিয়েছেন। সেদিন ওই পথে হাঁটতে হাঁটতে আমার মনে হয়েছিল,পাশের শ্মশান থেকে গ্রামের মৃতদের কেউ কেউ ওই ঘন কালচে ডালপালায় পাতায় পাতায় শান্তি পেতে, বিশ্রাম নিতে আসবে। শুক্লপক্ষে চাঁদ রোজ রাতে একটু একটু করে বাড়বে। বাড়তে বাড়তে আকাশ পাড়ি দেবে। মায়ের কাছে শুনেছি এইপক্ষে কোনদিনে কাদের আত্মার প্রতি তর্পন করা হয় ; প্রতিপদে মাতামহদের, চৌথা ভারনি এবং ভারনি পঞ্চমীতে বিগত বছরে প্রয়াতদের, অভিধাব নবমীতে সধবা অবস্থায় যারা মারা গিয়েছেনতাঁদের স্বামীরা পাঁচজন ব্রাহ্মন মহিলাকে নিমন্ত্রণ করে খাওয়াবেন। দ্বাদশীতে শিশু অবস্থায় যারা মারা গিয়েছে আর চতুর্দশীতে যুদ্ধে মৃত সৈনিক এবং পারিবারিক কিম্বা ব্যক্তিগত শত্রুর আক্রমণে নিহতদের আত্মার উদ্দেশ্যে  তর্পন করা হবে। অন্যদিকে ঢাকের শব্দে আকাশ বাতাস ক্রমে মথিত হয়ে উঠবে। আমরা পুজোর আনন্দে মেতে থাকবো। তারপর রাতের শিশির আর জ্যোৎস্নায় মাখামাখি হয়ে কোজাগরীর রাতে এক ধূসর মায়াময় চরাচর। এখনও, এই হাইটেক যুগেও ত্রিপুরা প্রকৃতির মায়াময়তায় ভুলিয়ে দেওয়ার সামর্থ্য রাখে। জলা জায়গায় আলেয়া আর বনের ঝোপে জোনাকির পুঞ্জ জ্বলে। নতুন মাত্রা যোগ করেছে রেলগাড়ি। অন্ধকারে ছোট শহর গ্রাম মাঠ পাহাড় জঙ্গল ভেদ করে ট্রেন যায়।

মায়ের মৃত্যুর পর যেদিন শ্যামলী বাসে চেপে বাংলাদেশ হয়ে কলকাতা ফিরছিলাম, সেদিনটাও ছিল মহালয়া। ছোটমামা টি আর টি সি স্ট্যান্ডে এসেছিলেন, ছোটমামা আমার কাছে বড়ভাইয়ের মতন, মা তাঁকে ও মেজমামাকে কোলেপিঠে করে মানুষ করেছে বলে ওঁরা মায়ের ন্যাওটা ছিলেন। জীবনে ওই একবারই ছোটমামাকে কাঁদতে দেখেছি। আমারও চোখে জল। ভারাক্রান্ত মনে বাসে করে ঢাকা হয়ে সেই রাতেই কলকাতা যাওয়ার পথে সীমানাহীন বুড়িগঙ্গায় বার্জের ডকে দাঁড়িয়ে দুটি একলা মাঝির ছোট নৌকা দেখেছিলাম, তাঁরা পরস্পরকে চেঁচিয়ে বলছিলেন, আপন ডাইন, আপন ডাইন! প্রথমে বুঝতে পারিনি, ঢাকা থেকে  কলকাতাযাত্রীএক প্রৌঢ়কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, বাঙ্গালি মাঝিদের নৌ-চালনার রীতি বাঁ দিক ঘেঁষে চলা নয়, আমেরিকান কিম্বা চীনাদের মতন ডানদিক ধরে চলা। ভদ্রলোক রসিকতা করে বলেন, স্থলে বাঙালি যতই বামপন্থী হোক না কেন, জলে আবহমান কাল ধরেই ডানপন্থী!

মহালয়ার ক্ষেত্রেও এমনভাবে বলা যায়, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রকে এক্ষেত্রে বিগত তিন প্রজন্মের বাঙালি তাঁর হৃদয়ে এমন স্থান দিয়েছে যে মহানায়ক উত্তমকুমার চেষ্টা করেও সেই স্থান দখল করতে পারেননি। ত্রিপুরাবাসীর ক্ষেত্রেও একথা সত্য। আমাদের মনে তিনি ও তাঁর নেতৃত্বে প্রবাদপ্রতিম শিল্পীরা বাণীকুমারের গীতিনাট্যকেএমন উচ্চতা দিয়েছেন যে আমাদের অজান্তেই ধর্মীয় তর্পনের অনেক উর্ধে স্মৃতিতর্পনে নিয়ে যেতে পেরেছেন।

আমি ইশ্বরবিশ্বাসী নই, আবার নাস্তিকও নই। আসলে এ সম্পর্কে আমার কাছে কোনো প্রমাণ, অভিজ্ঞতা বা জ্ঞান নেই। জ্ঞান নেই বলে ঈশ্বর কখনও আমার বিষয় হয়নি। বাবা মানা করেছিলেন বলে কোনদিন মহালয়ায় তর্পন করিনি। তাঁর দর্শন অনুযায়ী মৃত্যুর পর তিনি আমাদের স্মৃতি ছাড়া আর কোথাও নেই। আজ এই লেখার মাধ্যমে আমি মহালয়া শ্রোতা বাবামায়ের স্মৃতিতর্পন সারলাম। শান্তি দিলে ভরি...

  ত্রিপুরা ফোকাস  । © সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ত্রিপুরা ফোকাস ২০১০ - ২০১৭

সম্পাদক : শঙ্খ সেনগুপ্ত । প্রকাশক : রুমা সেনগুপ্ত

ক্যান্টনমেন্ট রোড, পশ্চিম ভাটি অভয়নগর, আগরতলা- ৭৯৯০০১, ত্রিপুরা, ইন্ডিয়া ।
ফোন: ০৩৮১-২৩২-৩৫৬৮ / ৯৪৩৬৯৯৩৫৬৮, ৯৪৩৬৫৮৩৯৭১ । ই-মেইল : This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.