মোলাতি (অনুগল্প)

শিবাশিস চট্টোপাধ্যায়

মোলাতি

 

মোলাতি বুড়ির পেটে বাচ্চা এসেছে। এই নিয়ে গেরামে তুমুল ফিসফাস। মোলাতি বুড়ি প্রায় বাল্য বিধবা। স্বামী গত হওয়ার পর এতো বছর শুধু 'মোলা' বেঁচে টিকে আছে সে। এদিককার লোকেরা মোয়াকে মোলা বলে। গেরামের লোকের মুখে তাই সে আজ শুধু মোলাতি। নাম জিজ্ঞাসা করলেও বলে-মুই মোলাতি বাও(বাবা)- - -মোর অইন্য নাম নাই। কিন্তু এ-বয়সে মোলাতির হলো কি? কোথায় কে তার পেট বানিয়ে দিলো!

 

নিশ্চয়ই কোনো অসৎ মাছুয়ার খপ্পরে পড়েছিল সে।

 

মাছুয়াপাড়ায়ও নাকি প্রায়ই তাকে দেখা যেতো। কারও কারও মতে পর্বানন মালো নাকি গোপনে তাকে সাঙানি নিয়েছিল। সাঙানি নেয়া গাঁ-গঞ্জের সমাজে জায়জ হলেও লোকে শুনলে কেন জানি আজো কিন্তু কিন্তু করে।

 

অগত্যা গ্রামে সালিশ বসলো। রমণী দেওয়ানির সালিশে মোলাতিও সময়মতোই হাজির। উসকো-খুসকো চুল। লাল চোখ। একেবারে বেপরোয়া।

 

মুই কারো পরোয়া করং না। রমণী কায়? সোয়ামি মইল্লেক যখন তোমরা কায় মোক খোয়াইছেন?অর্থাৎ আমি কারও পরোয়া করি না। রমণী কে? স্বামী মরলে পরে কে আমায় দুটো খেতে দিয়েছে?

 

চুপ কর মোলাতি চুপ কর। সোয়ামিক খাছিস আর বড় বড় কথা কইস?(সোয়ামিকে খেয়েছিস আর মুখে বড় বড় কথা?) খেকিয়ে ওঠে রমণী দেওয়ানি।

 

স্বামীকে খাওয়ার কথা সে এ জীবনে অনেক শুনেছে। এ কথা শোনা মাত্রই বরাবরের মতো এবারও চুপসে যায় সে।

 

তারপর সালিশ সভায় অনেক অকথা-কুকথা হলো। কিছুটা মোলাতির কানে গেল কিছুটা গেল না। হেট মাথা কি আর এ জীবনে সোজা করতে পারবে মোলাতি? কী করবে এখন সে?

 

মোলাতির সামনে তিনটে মাত্র পথই এখন খোলা আছে।

১) পেটেরটার বাপকে খুঁজে বের করে সামাজিক ভাবে বিয়ে করা

২) গেরাম ছেড়ে গঙ্গাধরের ওপারে যে দিকে ইচ্ছে চলে যাওয়া

৩) গঙ্গাধরের উত্তাল জলে ঝাঁপিয়ে নিজেকে শেষ করে দেয়া

 

প্রথমটা তাঁর একেবারেই পছন্দ নয়। যে সমাজ মোলাতিকে দেখেনি সে সমাজের স্বীকৃতি সে আর কোনোভাবেই চায় না।

 

দ্বিতীয় পথটি মন্দ নয়, বরং ভালই। দূরে কোথাও পাড়ি দেয়ার স্বপ্নতো এর আগেও সে বহুবার দেখেছে। শুধু সাহসে ভর করে গেরাম ছেড়ে বেরোতে পারেনি।

 

তেমন হলে অন্তত এ লোকগুলির মুখ তাকে রোজ রোজ আর দেখতে হবে না।

 

আর তৃতীয়টির কথা সে এ মুহুর্তে ভাবতে চায় না। গঙ্গাধরে এখন জল কম।