ত্রিপুরা ফোকাস

No result ..

পুণ্যশ্লোক’দা দাঁড়াও, আমি তোমার হাত ধরব

জুবিন ঘোষ

পুণ্যশ্লোকদা দাঁড়াও, আমি তোমার হাত ধরব

(Memories of poet Punyaslok Dasgupta Part 1)

হ্যাঁ, শিরোনামের ঠিক এই বাক্যগুলোই লেখা ছিল পুণ্যশ্লোক’দার লেখা জুবিনপর্ব–এর ২য় কবিতায়। আজ সত্যিই ইচ্ছে করছে শেষবেলায় যদি হাতটা ধরতে পারতাম পুণ্যশ্লোক’দা অনেক শান্তি পেতেন। ক’দিন আগেই আমাকে ডেকেছিলেন, কিন্তু আমি যেতে পারিনি, ঠাকুমা মারা গেছিলেন, বিপর্যস্ত ছিলাম মানসিকভাবে। ফোনটা এসেছিল ১৮ই জুলাই নাগাদ। তিন–চারদিন পরেই ছিল শ্রাদ্ধ। সেই কথা বলে বললাম, একটু সময় দাও আমি আসছি। উনি বললেন, “তুমি এলে আমার লেখাগুলোর একটা ব্যবস্থা করা করব। অনেক লেখা পড়ে আছে, পরের বইগুলো ঠিক করে করতে হবে। অনেক লেখাপত্তর আছে, বই অনেক পড়ে আছে, এছাড়াও ছড়িয়ে ছিটিয়ে অনেক কবিতা। তুমি এলে ঠিক করব।“

আর একটা কথাও বললেন যে উনি কলকাতা বা তার খুব কাছাকাছি মফস্‌সলে থাকতে চান বাকিটা জীবন। ওই বাড়িটা নাকি বিক্রি করে দিয়ে কলকাতার দিকে থাকবেন। আমি বললাম, “অর্ণব’দা আর প্রিয়ংবদা’দির কাছে তো ভালই আছ... শুধু শুধু কলকাতা আসবে কেন। তাছাড়া তোমার এখন বিশ্রাম দরকার। কে কার কথা শুনবে।” পুণ্যশ্লোক’দার কথায় তিনি এখন চুটিয়ে আড্ডা দিতে চান, তরুণ কবিদের কাছে পাবার সবচেয়ে ভাল জায়গা কলকাতার আশেপাশ। এখান থেকে নিয়িমিত তিনি যাতাযাত করতে পারবেন। আমি বললাম, ঠাকুমার শ্রাদ্ধটা হয়ে যাক, নভেম্বর নাগাদ আমি আসছি। জুলাই থেকে তিনটে মাস লাগবেই এই শোকটা কাটিয়ে উঠতে। এরপর নভেম্বর আসার আগেই পুণ্যশ্লোক’দা ফাঁকি দিয়ে চলে গেল। এখনও নভেম্বর আসেনি। পুণ্যশ্লোক’দা বলেছিলেন, “আমি চলে গেলে কে এসব গুছিয়ে রাখবে, তোকে বুঝিয়ে দিয়ে যেতে চাই।” আমি বুঝতে চাইনি। আসলে আমি ভাবতেই চাইনি পুণ্যশ্লোক’দা চলে যেতে পারেন।

                 ১লা মার্চ হঠাৎ খবর পেলাম পুণ্যশ্লোক’দা খুব অসুস্থ, হার্ট অ্যাটার্ক হয়েছে। কলকাতায় নিয়ে আসা হচ্ছে পিজি হাসপাতালে। অর্ণব’দার (পুণ্যশ্লোক’দার জামাই) সঙ্গে যোগাযোগ করে আমিও বিকেলে পিজিতে চলে এলাম। ইতোমধ্যে শমীক জয় সেনগুপ্ত, মমতা দাস এঁরা কবির সঙ্গে। দেখলাম পুণ্যশ্লোক’দা পিজিতে ভর্তি হতে পারেননি। শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালের জীবনানন্দ ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছেন। আমি পিজি থেকে সেখানেই ছুটে গেলাম। অর্ণব’দা অপেক্ষা করছিলেন, সঙ্গে নিয়ে গেলেন জীবনানন্দ ওয়ার্ডে। এখানেই ছিলেন কবি জীবনানন্দ। পিয়াস মজিদের সঙ্গে এখানে আগে এসেছিলাম।

                পুণ্যশ্লোক’দা শুয়ে আছেন, আমাকে দেখেই যেন ম্যাজিকের মত ক্রমশ সুস্থ হয়ে উঠতে লাগলেন। বলল, “এখন বেশ ভাল আছি।” তখনও বারবার বললেন যে তাঁর কাছে আসতে সুস্থ হয়ে উঠলে। আমি পিঠে বুকে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলাম। চোখ বুজে আরাম খাচ্ছিলেন। চোখের কোণে আনন্দাশ্রু। সেদিন পুণ্যশ্লক’দার হাতে তুলে দিয়েছিলাম আজকের অনির্বাণ পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়া পুণ্যশ্লোক’দা একবছর ধরে চলা ধারাবাহিক, ‘ডুয়ার্স আমার স্যুইজারল্যান্ড’। কী অপুর্ব সে লেখা। পুণ্যশ্লোক’দা একটু দেখার চেষ্টা কলেন, ভাল করে চোখে দেখতে পাচ্ছিলেন না। বললেন, তোকে আরও লেখা দেব।” মমতা দাসের কাছে অনেক অপ্রকাশিত লেখা রেখে গেছেন। এই পত্রিকাগুলোও তিনি প্লাস্টিকসুদ্ধু মমতা দাসের হাতে গচ্ছিত করে দিলেন। কী খুশি তখন। খুশিতে মুখটা ঝলমল করছে পুণ্যশ্লোক’দার। কথা বলতে তাঁর অসুবিধা হচ্ছিল। বাকিদের সঙ্গে ইশারায় বা মিষ্টি হাসিতে কথা হচ্ছিল। এর বেশি কিছু বলছিলেন না। আমার সঙ্গে কিন্তু থেমে থেমে ফিসিফিসিয়ে হলেও কথা হচ্ছিল। যেটুকু কথা হচ্ছিল না, সেটুকুও আমি বুঝে যাচ্ছিলাম। এমনটাই ছিল আমাদের দুই অগ্রজ ও অনুজ কবির যুগলবন্দির রসায়ন। বললেন যে শিলিগুড়ির হাসপাতালে থাকবার সময় ডাক্তারের কাছ থেকে কাগজ পেন নিয়ে দারুণ সব কবিতা লিখেছেন। আমি বললাম, “সেগুলো কোথায়?” বললেন, “লুকিয়ে রেখেছি বাড়িতে।” অর্ণব’দাও বললেন সেই কথা যে, এরকম সিরিয়াস কনডিশনেও কবিতা লেখার কথা ভুলে যাননি। আর কয়েকজন দেখা করতে এলেন। প্রত্যেকেই এলেন কবির টানে। অনেকক্ষণ পুণ্যশ্লোক’দার সঙ্গে ছিলাম। পুণ্যশ্লোক’দা বলেন, “বারবার আসবি। আমি তোকে দেখলে সুস্থ থাকি।” আমিও তাই চাইছিলাম, যাতে পুণ্যশ্লোক’দার সঙ্গে থাকি। বললাম, “৪ তারিখ আবার আসব।” নিচে অর্ণব’দার সঙ্গে এলাম। শুনলাম, মাইনর স্টোক হয়েছিল। কিডনিতে সমস্যা আছে। চোখেও কম দেখছেন। পেসমেকারটাও ক্রমশ পুরোনো হয়েছে। এছাড়া ডায়াবেটিসও আছে। ফলে কোনটা ছেড়ে কোনটা চিকিৎসা করতে হবে ডাক্তাররাও দ্বিধায়। ডাক্তাররা ব্লাড স্পেসিমেন নিয়েছেন। এছাড়াও পরীক্ষা করেছেন, সব রিপোর্ট সেদিন সন্ধে বা রাতেই হাতে পাবেন অর্ণব’দা। পুণ্যশ্লোক’দা নাকি বাড়িতে একদম কথা শোনেন না। কোথাও সাহিত্যসভায় ডাক পেলে আনচান করেন। কখনও কখনও কিছু কথা না শুনেই চলে যান। আমি পুণ্যশ্লোক’দাকে বলে এসেছিলাম, ক’দিন কথা শোনো। সুস্থ হুও তারপর যেও। সেদিন এরপর চলে এসেছিলাম।

               কিন্তু সেদিন আর যাওয়া হয়নি। আমার দিদি মানে ঠাকুমার ৩রা মার্চ স্টোক হয়ে গেল। মুখ দিয়ে গলগল ফেনা। অফিস থেকে ডায়রেক্ট আজকের অনির্বাণ পত্রিকার অফিসের অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে এসেছিলাম। এরপর দিনরাত্রি হাসপাতালেই পড়ে থেকেছি। ঠাকুমাকে ছেড়ে দেবার পরও যেহেতু খুবই অসুস্থ ছিলেন তখন আর পুণ্যশ্লোক’দার কাছে যাওয়া হয়নি। ইতিমধ্যে কবি সুবোধ সরকারের সহায়তায় পুণ্যশ্লোক’দা পিজির কেবিনে ভর্তি হয়েছিলেন। কিছুদিন বাদে ফিরেও গেছিলেন। আমি চারমাস অক্লান্ত ঠাকুমার পাশে থেকেছি। যাওয়ার অবস্থা ছিল না। সাহিত্যের ধারেকাছেও ছিলাম না। কিন্তু একবার দক্ষিণেশ্বর গেছিলাম। ঠাকুমার জন্য পুজো দিয়ে এসেছিলাম। সেদিন পুণ্যশ্লোক’দার জন্যেও সুস্থতার কামনা করেছিলাম। একটু ফ্রি হতাম নভেম্বরের দিকে। ভীষণ ইচ্ছে ছিল তারপরেই পুণ্যশ্লোক’দার কাছে যাব তারপর আসামে কর্নেল নির্মাল্য ব্যানার্জীর কাছে যাব। কিন্তু সেই সুযোগ আর দিলেন না পুণ্যশ্লোক’দা।

               ফেসবুকে ছিলাম না গত একবছর। কোনও পোস্ট দেখা হত না, শুধু আজকের অ–নির্বাণ পত্রিকা বেরোলে আমি তার একটা পোস্ট দিয়ে আসতাম, আর মাঝে মাঝে জরুরি লেখা চাওয়ার থাকলে মেসেঞ্জারে ঢুকতাম। ঠাকুমা মারা গেলেন ১০ই জুলাই। আমার কবিতা লেখার সবচেয়ে বড় অণুপ্রেরণাদাত্রী তিনি। আমাকে ছোট থেকে মানুষ করেছেন, ফলে শোকপর্বটা ভয়াভয় ছিল। সামলে উঠতে পারছিলাম না। এক বিরাট শূন্যস্থান তৈরি হয়েছিল আমার মনে। ফলে ফেসবুকে টুকরো টুকরো পুণ্যশ্লোক’দা আবার হাসপাতালে যাওয়ার খবর ভেসে এলেও আমার পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না শেষ ক’দিনে। এই আপসোস যাওয়ার নয়। জানলে সব ছেড়ে তক্ষুণি চলে যেতাম। 

               খবরটা পেলাম মারা যাবার দিন সকালে। মেজর স্ট্রোক। পালস ৯। কবি কোমায় চলে গেছেন। বাকি সমস্ত অঙ্গ ডিটোরেট করছে। মিলনের ফোন পাবার সঙ্গে সঙ্গে চোখে জল এসে গেল। অর্ণব’দার ফোন বন্ধ। প্রিয়ংবদা’দির ফোন সেভ করে রাখা হয়নি। শমীক জয় সেনগুপ্তকে ফোন করলাম। সেদিন ওদের সন্ধেবেলা অনুষ্ঠান। আমি এই মনের অবস্থায় ওর অনুষ্ঠানে যোগ দেবার মত তৈরি ছিলাম না। শিলিগুড়িতে তরুণ কবি সুমন মল্লিকের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। শুনলাম সে হাসপাতাল থেকে চলে এসেছে। পুণ্যশ্লোক’দা এখনও বেঁচে আছেন। কিন্তু অবস্থা সত্যিই খুব ভাল নয়। যে কোনও মুহূর্তে খারাপ খবর পেতে পারি। মানে ওখানকার কবিরা আশা ছেড়েই দিয়েছে প্রায়।

                ইচ্ছে করছিল তক্ষুণি দমদম থেকে বাগডগরা উড়ে যাই। কিন্তু উপায় ছিল না, আমি প্রিয়জনদের শেষ মুহূর্তে দৃশ্য দেখতে পাই না। বলা খারাপ, দেখতে চাই না। ঠাকুরদা যখন মারা গেছিলেন, দেখিনি। আমার কাকা যখন মারা গেছিলেন আমি বলেছিলাম দেহ দাহ করে দাও আমি দেখব না। আমার ঠাকুমার বেলাতেও মারা যাবার পর আমি তিনদিন বাড়ি ঢুকিনি। বলেছিলাম ঠাকুমার দেহ দাহ করে দাও আমি দেখব না। দেখিওনি। মৃত্যুর পরবর্তী দৃশ্য তথা শেষযাত্রা আমি দেখিনি। জানি, পুণ্যশ্লোক’দার অবস্থা ক্রিটিক্যাল। তবু সারাক্ষণ প্রার্থনা করছিলাম এবারকার মত যেন পালস্‌ রেট বেড়ে যায়, কিছু একটা মিরাক্যাল হোক। দুপুরে মমতা দাসের সঙ্গে বাধ্য হয়ে ফেসবুকে যোগাযোগ করলাম। শুনলাম তাঁর কর্তা চলে যাওয়ায় তিনিও এখন বাইরে। বেলা তিনটের সময় মিলনের ফোনের অপেক্ষা করছিলাম। কারণ মিলন শিলিগুড়িতে কারুর সঙ্গে একটা যোগাযোগ রাখছিল। অনেক কথা হল সেই সময়। সন্ধেবেলা মিলন জানাল আমাদের পুণ্যশ্লোক’দা আর নেই। ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেছিলাম ফোনেতেই। আর একটু অপেক্ষা করতে পারলেন না পুণ্যশ্লোক’দা। ফাঁকি মেরে চলে গেলেন। জুবিনের জন্য অপেক্ষায় থাকতে থাকতে চলে গেলেন। সব কিছু তচনচ হয়ে গেল। ফেসবুকে শোকবার্তা শয়ে শয়ে। আমি একটাও কথা লেখবার মত অবস্থায় ছিলাম না। একটা কথাও তাই লিখিনি। লিখিতে পারছিলাম না। কার জন্য লিখব। মানুষকে কী দেখাব? কী বলব, কী দেব! কী হবে এসব করে। এসব মনে হচ্ছিল। ভয়ঙ্কর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলাম। ঠিক করলাম লিখব। পুণ্যশ্লোক’দার কাব্যকীর্তি, জানা–অজানা অনেক কথা শুধু লিখে যাব বাংলার পত্রপত্রিকাজুড়ে। শুধু বারবার মনে হচ্ছে পুণ্যশ্লোক’দাকে ডেকে আবার বলি, “পুণ্যশ্লোক’দা দাঁড়াও, আমি তোমার হাত ধরব।”  

  ত্রিপুরা ফোকাস  । © সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ত্রিপুরা ফোকাস ২০১০ - ২০১৭

সম্পাদক : শঙ্খ সেনগুপ্ত । প্রকাশক : রুমা সেনগুপ্ত

ক্যান্টনমেন্ট রোড, পশ্চিম ভাটি অভয়নগর, আগরতলা- ৭৯৯০০১, ত্রিপুরা, ইন্ডিয়া ।
ফোন: ০৩৮১-২৩২-৩৫৬৮ / ৯৪৩৬৯৯৩৫৬৮, ৯৪৩৬৫৮৩৯৭১ । ই-মেইল : This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.