ত্রিপুরা ফোকাস

মেহগনি (অনুগল্প)

চিরশ্রী দেবনাথ

মেহগনি    (অনুগল্প)

আমার নাম দিত্রি। একটি ছোট শহরে আমাদের বাড়ি।

এই শহরে মার্চ মাসে খুব পাতা ঝরে। আমি আর বাবা যে বাড়িটায় থাকি সেই বাড়িতে একটি মেহগনি গাছ আছে।

সমস্ত বাড়ি, একটিই গাছ। মস্ত ছায়া।

রাশি রাশি ঝরা পাতা। আর কিছু নিশ্চুপ ঝোপঝাড়। মা আসে মাঝে মাঝে। বিকেলের সূর্যকে পেছনে ফেলে। রাতে থাকে। একটা দিন। চলে যায়।

তারপর, আমি আর বাবা আর মস্ত মেহগনি গাছ। ঝরা পাতা। সুন্দর দিদা আসে, সারাদিন থাকে। রান্না করে। ঘর পরিস্কার করে। বিকেলে চলে যায়। মা এলে টগবগ করে গল্প ফুটতে থাকে।

বাবার চশমা, শার্ট, আমার রকমারি টিফিন, মায়ের এককুচি কাণের দুল। ... আনন্দ।

মায়ের সঙ্গে বাবার ডিভোর্স হয়েছে কয়েকবছর।

মা চলে গেছে শুধু। ফেলে যায়নি আমাকে আর বাবাকে।

আমি চাপা ঝগড়া শুনি। ভয় পাই না। আফসোস নেই। আশংকা নেই। মা চাপ চাপ গলায় বলে, অন্য কাউকে ভালোবাসলে, চলে যেতে হয় তার কাছে।

না হলে মিথ্যে হয় সব। পৃথিবী মিথ্যে হয়ে যায়। বাবা বলে, এখানে আমাদের সঙ্গে থেকেও তুমি ভালোবাসতে পারো। মা চুপ করে থাকে। কথা শেষ হয়ে যায়। আবছা ভোর হয়। সব আদর এখানে ওখানে ছড়িয়ে দিয়ে, মা চলে যায়।

ওনার কাছে মা আমাকে একবার নিয়ে গিয়েছিল। এক পা নেই। রোগা শরীর। শুধু একটি ভারী গলা। তাকে নাকি মা ছোট বেলা থেকেই ভালোবাসতেন। মাঝে উনি হারিয়ে গেলেন। মাকে দাদু দিদা বিয়ে দিলেন জোড় করে।

বাবা খুব ভালো। দশবছর বছর পর মায়ের বন্ধু ফিরে এলো। মার সঙ্গে দেখা হলো। মা বললেন তিনি যাবেন। বাবা বললেন যাও। চাকরী করে মা। বাবাও। মা অর্ধেক টাকা আমার নামে দিতে লাগলেন। আর বাকি অর্ধেক দিয়ে সেই ভদ্রলোক আর মা। ছুটির দিনে আমাদের কাছে ছুটে আসা। আবার চলে যাওয়া। আমার বন্ধুরা আমার মাকে খুব খারাপ বলে।

আমার বাবার বন্ধুরা আমার মাকে খুব খারাপ বলে। আমাদের আত্মীয় স্বজনরা মার সঙ্গে কথা বলে না।

আমি আর বাবা আমার মাকে খুব ভালোবাসি। মা একদিন খুব ভোরে এসে বাবাকে ডাকতে লাগলেন। ওনার খুব শরীর খারাপ। বাবা গেলেন। আমিও গেলাম। তিনি মারা গেলেন।

মা আবার সবসময়ের জন্য এ বাড়িতে চলে এসেছেন। কিন্তু মা আর আমাদের বাড়ি বলে না। বলে তোমাদের বাড়ি। সব আগের মতো। বাবা আর মা মেহগনির ছায়ায় বসে কথা বলে অনেক রাত। আমি অল্প অল্প শুনি ঘর থেকে। বাবা একদিন বললেন, ডিভোর্সটার কি হবে। মা বললেন, সত্য, সত্যের মতো থাক। বাবা তখন থমকে যান। বাবার স্মার্টনেস কমে যায়। কেমন দুঃখী দুঃখী গলায় বলতে থাকেন, মৌনী, আমাদের মেয়ের বিয়ে হবে না কিন্তু। লোকে খুব মন্দ বলবে।

আমার মায়ের নাম মৌনী। মৌনী নামের মেয়েটির চিবুক শক্ত হয়। গলা দৃপ্ত হয়। বলে, তার আগে আমি মরে যাবো দেখো। বাবা বলে, আমি লোকজন ভয় পাই। মৌনী বলে এতোদিন আমাকে কোন বাধা দাওনি কেন? বাবার মাথা আরো নীচু হয়ে যায়। মৌনী কাঁদতে থাকে, বাবার হাঁটুতে মাথা রেখে। পিঠ উপচানো রেশমের মতো চুল মার। বাবার আঙুলগুলো সেই চুলে ডুবতে থাকে।

আমার তখন, মৌনীর কাছে, বাবার কাছে যেতে ইচ্ছে করে। মেহগনি না করে। বলে এসময়টি শুধু মৌনীর আর বাবার ...শুধু বাবার আর মার। মৌনীর চারপাশে তেতাল্লিশ বৎসর। আমার চারপাশে আঠারো। বাবার চারপাশে সাঁতচল্লিশ। মৌনীর আবেগ বেশী। ভালোবাসা বেশী। বাস্তববুদ্ধি নেই। বাবা বেশী ভালো। বাবার আরো বাস্তববুদ্ধি নেই। আমি দুজন বাস্তববুদ্ধিহীন, চুরান্ত ইমোশোনাল বাবা ও মায়ের মেয়ে।

মা বলেছেন, যাকে ভালবাসে মানুষ, তার কাছে যেতে হয়। বাবা বলেছেন যাও। মা গেলেন। বাবা আবার বললেন এসো। মা আবার এলেন। এখন মা ও বাবা দুজনেই প্র্যাক্টিকেল হয়েছেন।

আমার আঠারো বছর হয়েছে। এখন তারা বুঝতে পারছেন, আমার বিয়ে হবে না। লোকে নিন্দা করবে। আমি কিন্তু খুব এডাল্ট। সব বুঝি। আমি অনেক পড়াশোনা করবো। রোজগার করবো।

আর বাবার মতো একজন ইমপ্র্যাক্টিকেল মানুষের জন্য সারা জীবন অপেক্ষা করবো, মেহগনি গাছের বাড়িতে।

এই শহরে সারা মার্চ মাস জুড়ে পাতা ঝরে ।

খুব স্বাভাবিক এইসব বসন্তকালের জন্য আমিও মার মতো ইমোশোনাল হবো। হৃদয় ভর্তি কষ্ট নিয়ে মেহগনির ছায়ায় বসে থাকবো।

  ত্রিপুরা ফোকাস  । © সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ত্রিপুরা ফোকাস ২০১০ - ২০১৭

সম্পাদক : শঙ্খ সেনগুপ্ত । প্রকাশক : রুমা সেনগুপ্ত

ক্যান্টনমেন্ট রোড, পশ্চিম ভাটি অভয়নগর, আগরতলা- ৭৯৯০০১, ত্রিপুরা, ইন্ডিয়া ।
ফোন: ০৩৮১-২৩২-৩৫৬৮ / ৯৪৩৬৯৯৩৫৬৮, ৯৪৩৬৫৮৩৯৭১ । ই-মেইল : This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.