ত্রিপুরা ফোকাস

মুহুরিচরে আশঙ্কার কালো মেঘ

মুহুরিচর–বিতর্কের স্থায়ী সমাধানে এবার তৎপরতা শুরু করল বাংলাদেশ সরকার। যত দ্রুত সম্ভব নির্ধারিত সীমানায় পাকা খুঁটি পোঁতার কাজ শুরু করতে চাইছে হাসিনা সরকার। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের নেতৃত্বে এক উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল সফর করে বিতর্কিত মুহুরিচর। এর পরই দু’‌দেশের সীমান্তে বসবাসকারীদের মনে আবারও জমা হয়েছে আশঙ্কার কালো মেঘ। কাদের জমি যাচ্ছে আর কারা পাচ্ছেন নদীর স্রোতে তলিয়ে যাওয়া সেই পুরনো মাটি। জটিল অঙ্ক কষা শুরু হয়ে গেছে আবার।সূত্রের খবর, সর্বশেষ জরিপ অনুসারে বিতর্কিত ৬৬ একরের প্রায় ৬০ একর জমিই বাংলাদেশ তাদের দখলে রাখতে সমর্থ হয়েছে। মুহুরিচরের প্রায় ৭০ জন জোতজমির দাবিদার ও ত্রিপুরা সরকারের সব আপত্তি সত্ত্বেও ভারত সরকার বাংলাদেশকে এই জমি হস্তান্তরে রাজি হয়েছে বলে বাংলাদেশের তরফে দাবি করা হয়েছে। ভারত সরকারের তরফে সেই আশ্বাস পাওয়ার পরই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার  নির্দেশে সে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এদিন বিলোনিয়া সীমান্তে আসেন।

এদিন ভারতীয় সময় সকাল সাড়ে ১১টায় সেনাবাহিনীর চপারে করে প্রথমে  পরশুরাম আসেন মন্ত্রী। সেখান থেকে বড়সড় দল নিয়ে সোজা চলে আসেন বাংলাদেশের বিলোনিয়া সীমান্তে। সফরকালে তাঁর সঙ্গে ছিলেন সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মহম্মদ সফিকুল ইসলাম, ফেনির জেলাশাসক, আমিনুল ইসলাম, ফেনি জেলার সাংসদ শিরিন আখতার–সহ আরও বেশ কয়েকজন। বাংলাদেশের বিলোনিয়া সীমান্তে অবস্থিত মজুমদারহাট বি জি বি ক্যাম্পে গার্ড অফ অনার গ্রহণ করার পর মন্ত্রী–সহ প্রতিনিধিদলটি  চলে যান বিতর্কিত মুহুরিচর পরিদর্শনে। ২০১৫ সালে দু’‌দেশের ভূমি জরিপ দপ্তর কর্তৃক পুঁতে দেওয়া কাঠের খুঁটি দিয়ে চিহ্নিত বাংলাদেশের প্রাপ্য জমি পরিদর্শন কালে মানচিত্র–সহ সবটা বুঝে নেন তাঁরা। এর পর দুটি নৌকা করে মুহুরি নদীপথে ঘুরে দেখেন এলাকা। এই সময় বি এস এফের তরফে মুহুরিঘাট চেকপোস্টে উপস্থিত ছিলেন বি এস এফের ডি আই জি অশোককুমার যাদব ও সি ও ব্রিজেশ কুমার। মূলত তাঁদের নির্দেশেই বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের  সফর চলাকালীন কোনও ভারতীয় কৃষক কিংবা এলাকার মানুষকে ত্রিসীমানায় ঢুকতে দেওয়া হয়নি। এমনকি সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদেরও মুহুরিচরে যেতে বাধা দেয় বি এস এফ। বি এস এফের আচরণে ক্ষোভ প্রকাশ করেন  অনেকেই। এমনকি বাংলাদেশ থেকে পুলিস, সেনাবাহিনী ও সংবাদকর্মীরাও স্তম্ভিত হয়ে যান। প্রায় আড়াই ঘণ্টার বৈঠক শেষে প্রতিনিধিদল রওনা হন ঢাকার উদ্দেশে।  যতদূর সূত্রের খবর, রাতেই বাংলাদেশের এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয় সীমান্তের সমস্যা ও মুহুরিচর নিয়ে। প্রসঙ্গত, দীর্ঘ ৬০ বছর ধরে ভারত–বাংলাদেশের মধ্যে এই মুহুরিচরের বিরোধ চলে আসছে। মুহুরিচর দখল নিতে গিয়ে ১৯৭১ সাল থেকে ১৯৯৯ সালের ২২ আগস্ট পর্যন্ত দফায় দফায় ৫৮ দিন বি এস এফ এবং বি জি বি (‌বি ডি আর)–এর মধ্যে গুলির লড়াই হয়। ইন্দিরা–মুজিব চুক্তি অনুসারে নদীর মাঝ বরাবর সীমানা ধরে দু’‌দেশের সীমানা নির্ধারণ করা হয়। কিছু টানা বিবাদের ফলে একসময় দু’‌দেশের যৌথ নদী কমিশন (‌জে আর সি)‌ এক বৈঠকে এই চরটিকে ডিসপিউটেড বা অমীমাংসিত হিসেবে ঘোষণা দেয়। এই চরের মূল আয়তন প্রায় ৯২.৩৩ একর। এর মধ্যে ৬৬ ভাগ ভারতের। বাকি ২৪ ভাগ চর এলাকা অমীমাংসিত। কিছু বাংলাদেশি বরাবরই দাবি করে আসছেন, চরের আয়তন ৭৯ একর। আর ৫০ একর চর ডিসপিউটেড। ভারতীয় সীমান্তে বসবাসকারী জনগণের দাবি, নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে চরের আয়তন বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু এর ফলে চরে জোতজমির দাবিদার প্রায় ৭০ জন কৃষকের জমি বাংলাদেশে দাবি করাটা অন্যায়। তাঁদের মতে, চরের ওপারে থাকা নিজ কালিকাপুরেও ভারতীয় জায়গা আছে। তা ছাড়া পিলার নম্বর ২১৫৮ থেকে ২১৬০ পর্যন্ত যে বিতর্কিত চর নিয়ে এত আলোচনা, তার মধ্যে রয়েছে ভারতের একটি শ্মশান। যা স্বাধীনতার আগেকার সময়ের। তা–ও কীভাবে বাংলাদেশ দাবি করছে, বুঝতে পারছেন না অনেকে। যদিও সবশেষে ভূমি জরিপ দপ্তর যে কাঠের খুঁটি পুঁতে গেছে, তার মধ্যে এই শ্মশানটিকে ভারতীয় সীমান্তে রাখা হয়েছে। কিন্তু ৬৬ একর বিতর্কিত চরের ৬০ একরই বাংলাদেশ তাদের সীমানায় ঢুকিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে। বিষয়টি একতরফা সার্ভে করা হয়েছে দাবি করে ত্রিপুরা সরকারের পক্ষ থেকে ভারত সরকারকে তাদের আপত্তির কথা জানানোর পর বেশ কিছু দিন বন্ধ ছিল সীমানা নির্ধারণের কাজ। অনেকেই আশায় বুক বেঁধে ছিলেন, হয়ত কিছু একটা সমাধানসূত্র খুঁজে বার করবে উভয় দেশ। তবে সম্ভবত তেমনটা হচ্ছে না। বাংলাদেশের এক আধিকারিকের মতে,  মুহুরিচর নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক পারদ চড়ছে বাংলাদেশে। ভারত তথা ত্রিপুরার সঙ্গে বরাবরই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা শেখ হাসিনা সরকারকে চাপে রাখতে নতুন করে মুহুরিচরকে হাতিয়ার করছেন বি এন পি প্রধান খালেদা জিয়া। প্রসঙ্গত, খালেদা জিয়া জন্মসূত্রে ফেনি জেলার পরশুরামের ফুলগাজির মেয়ে। চরের ওপরে মানুষকে এই নিয়ে বরাবরই ভুল বোঝাচ্ছেন জিন্নাপন্থীরা। দু’‌দেশের মধ্যে ছিটমহল চুক্তি বাস্তবায়নের পর ভারতের আনন্দনগর সীমান্ত সসম্যা সমাধানের পরেও কেন মুহুরিচর সমস্যা সমাধান করছে না বাংলাদেশ সরকার,  তা নিয়ে বিরোধীদের তোপের মুখে শেখ হাসিনার সরকার। আর তাই নতুন করে সীমান্ত সমস্যা সমাধানে খুব দ্রুত এগিয়ে যেতে চাইছে বাংলাদেশ। যা বৃহস্পতিবারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মুহুরিচর সফর থেকেই পরিষ্কার বলে মনে করছে তথ্যভিজ্ঞ মহল।

ভিডিও গ্যালারী

  ত্রিপুরা ফোকাস  । © সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ত্রিপুরা ফোকাস ২০১০ - ২০১৭

সম্পাদক : শঙ্খ সেনগুপ্ত । প্রকাশক : রুমা সেনগুপ্ত

ক্যান্টনমেন্ট রোড, পশ্চিম ভাটি অভয়নগর, আগরতলা- ৭৯৯০০১, ত্রিপুরা, ইন্ডিয়া ।
ফোন: ০৩৮১-২৩২-৩৫৬৮ / ৯৪৩৬৯৯৩৫৬৮, ৯৪৩৬৫৮৩৯৭১ । ই-মেইল : This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.