ত্রিপুরা ফোকাস

মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনে বি জে পি–র হুজ্জতি

একটি ক্লাবের সদস্যদের সঙ্গে বচসার জেরে বি জে পি সভাপতি বিপ্লব দেবের গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ এবং দেহরক্ষীর শূন্যে গুলি চালানোর ঘটনাকে ঘিরে রাজ্য রাজনীতি উৎসবের মরশুমেও উত্তপ্ত। শনিবার, লক্ষ্মীপুজোর দিন বি জে পি নেতারা মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারের বাড়ি ঘেরাওয়ের নামে পুলিসের সঙ্গে সঙ্ঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। এই ঘটনায় পশ্চিম থানার আই সি নারায়ণ সাহা–সহ ৪ পুলিসকর্মী জখম হন। বি জে পি–‌র অভিযোগ, জখম হয়েছেন তাঁদেরও ৬ সমর্থক। কিন্তু রাজ্যের যাবতীয় পরম্পরা ভেঙে লক্ষ্মীপুজোর দিন সর্বভারতীয় দলের রাজ্য নেতাদের নেতৃত্বে খোদ মুখ্যমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন অভিযানের যৌক্তিকতা অনেকেই খুঁজে পাচ্ছেন না। বিভিন্ন মহল থেকেই দাবি উঠছে, পুরো ঘটনার তদন্ত করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক।

শুক্রবার রাতের ঘটনায় বি জে পি–‌র অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিস ৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। আদালত ৪ জনকেই জামিনে মুক্তি দেয়। ঘটনার সূত্রপাত শুক্রবার রাতে নিউ বয়েজ ক্লাবের প্রতিমা নিরঞ্জন দিয়ে ফেরার সময়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, প্রতিমা নিরঞ্জন দিয়ে ক্লাব সমর্থকেরা যখন ফিরে আসছিলেন, সেই সময়ে রাস্তায় ‘বেআইনিভাবে’ দাঁড়িয়ে থাকা বি জে পি সভাপতির গাড়িটির পেছন দিকে সামান্য ধাক্কা লাগে প্রতিমা নিরঞ্জন দিয়ে সাউন্ড সিস্টেম নিয়ে ফেরা একটি গাড়ির। এতে বিপ্লববাবুর গাড়ির পেছনের দিকের একটি লাইট ভাঙে। গাড়িটিতে আঁচড়ও লাগে। এর বেশি কোনও ক্ষতি হয়নি বলে স্থানীয় মানুষ জানান। কিন্তু এতেই অত্যন্ত ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন বিপ্লববাবুর গাড়ির চালক ও দেহরক্ষী। তাঁরা ক্লাবের ছেলেদের সঙ্গে বচসায় জড়িয়ে পড়েন। প্রত্যক্ষদর্শীরা আরও জানিয়েছেন, একসময়ে উত্তেজিত দেহরক্ষী শূন্যে গুলি চালান। কোনও প্ররোচনা ছাড়াই তিনি গুলি চালান বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। শুধু তাই নয়, স্থানীয় মহিলাদের অভিযোগ, সরু রাস্তার মধ্যে প্রায়ই দাঁড়িয়ে থাকে বিপ্লববাবুর বিলাসবহুল গাড়ি। ফলে অন্য গাড়ি চলাচলের সমস্যা হয় বলেও তাঁদের অভিযোগ। শুক্রবারের ঘটনা প্রসঙ্গে পশ্চিম ত্রিপুরার জেলা পুলিস সুপার অভিজিৎ সপ্তর্ষী জানান, ঘটনার তদন্ত চলছে। এই ঘটনায় ৪ জনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। পুলিস সূত্রে খবর, জামিনে মুক্ত ধৃতেরা হলেন নিউ বয়েজ ক্লাবের সদস্য দিলীপ দাস ও অমিতাভ কর, বিসর্জন পার্টির গাড়ির চালক পার্থ দেব এবং ডেকরেটর কর্মী লিটন ভট্টাচার্য। পুলিসের এই ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে গ্রেপ্তারের ঘটনায়। স্থানীয় মানুষদের অভিযোগ, বি জে পি–‌র অভিযোগ শুনে বিনা কারণে পুলিস ৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। কোনও ধরনের ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেনি বলেই স্থানীয়দের বড় একটা অংশের দাবি। এর পাশাপাশি, কংগ্রেস পরিষদীয় দলনেতা গোপাল রায় দাবি তুলেছেন, গুলি চালনার ঘটনার তদন্ত করতে হবে। দোষী প্রমাণিত হলে কড়া শাস্তিরও দাবি করেন তিনি। অন্যদিকে, এই ঘটনার পরই প্রতিবাদে সোচ্চার বি জে পি। প্রতিমা ভৌমিক বি জে পি–‌র তরফে থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। সেই সঙ্গে সাংবাদিকদের ডেকে বি জে পি নেতাদের অভিযোগ, ‘সি পি এম আশ্রিত গুন্ডা’রা এই হামলা চালিয়েছে। বি জে পি সভাপতি শুক্রবার রাতে ঘটনাস্থলে না থাকলেও ‘নিরাপত্তার অভাব’ বোধ করে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে তিনি বাড়তি নিরাপত্তা চেয়েছেন। তাঁর এই ‘আবদার’ শুনে স্থানীয় মানুষ অবাক। কারণ নিউ বয়েজ ক্লাব একটি অরাজনৈতিক সংগঠন। এই ক্লাবের বহু সদস্য আছেন যাঁরা বি জে পি–‌র সমর্থক বলে পরিচিত। সবাইকে এভাবে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোয় বি জে পি–‌র ওপরই চটেছে আগরতলা ক্লাবগুলি। তারা সমবেতভাবে সোচ্চার হয়েছে বি জে পি–‌র এই একরোখা মানসিকতার। প্রতিবাদ জানিয়েছে কংগ্রেস, সি পি এম–সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও। কিন্তু এই বিতর্ক থামতে না থামতেই লক্ষ্মীপুজোর মতো উৎসবমুখর দিনে রাজ্যবাসীকে নতুন করে অশান্তি ‘উপহার’ দিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন বি জে পি নেতারা। কংগ্রেস থেকে আসা তিন প্রাক্তন বর্ষীয়ান নেতা, মন্ত্রীর নেতৃত্বে এদিন বি জে পি মুখ্যমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন অভিযানে নামে। প্রাক্তন মন্ত্রী জহর সাহা, প্রাক্তন বিধায়ক অরুণকান্তি ভৌমিক ও সুবল ভৌমিকের মতো বর্ষীয়ান নেতারা কী করে এরকম ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ আন্দোলনে সামিল হলেন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। রাজনৈতিক শিষ্টাচার ভুলে, কোনও অনুমতি ছাড়াই বি জে পি নেতা, কর্মীরা পুলিস কর্ডন ভেঙে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করেন হাই সিকিউরিটি জোনে। পুলিসকর্মীরা বাধা দিলে সঙ্ঘর্ষেও জড়িয়ে পড়েন বি জে পির নেতা, কর্মীরা। তাঁদের আক্রমণে পশ্চিম থানার আই সি নারায়ণ সাহা–সহ ৪ জন জখম হন। তবে পুলিসের পদস্থ অফিসারদের তৎপরতায় ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আসে। বি জে পি নেতা সুবল ভৌমিকের অভিযোগ, পুলিস বিনা প্ররোচনায় লাঠি চালালে ৬ জন দলীয় সমর্থক জখম হন। অন্যদিকে, জেলা পুলিস সুপার অভিজিৎ সপ্তর্ষী জানান, বি জে পি সমর্থকেরা সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করার পাশাপাশি পুলিসকর্মীদের ওপর আক্রমণ চালানোয় এদিনের ঘটনা নিয়েও মামলা রুজু করা হয়েছে। তবে লক্ষ্মীপুজোর মতো উৎসবের দিনে শহরে এ ধরনের ঘটনা যে মোটেই কাঙ্ক্ষিত নয়, সেটা একবাক্যে প্রায় সকলেই স্বীকার করছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সুশীল সমাজের বহু মানুষই বলছেন, উৎসবের দিনে রাজনৈতিক কর্মসূচি, এটা এ রাজ্যের সংস্কৃতি নয়। তাছাড়া মুখ্যমন্ত্রী কোনও দলের হন না, তিনি রাজ্যবাসীর। তাঁর বাড়িতে কথায় কথায় হামলা চালানো সুস্থ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পক্ষেও ক্ষতিকারক বলে তাঁরা মনে করেন। রাজনৈতিক নেতাদের আরও বেশি করে দায়িত্বশীল হওয়ার পরামর্শও দেন তাঁরা। মজার কথা, বি জে পি–‌রও একটা বড় অংশ চায়নি, ঘরে ঘরে সবাই যখন লক্ষ্মীপুজোয় ব্যস্ত, তখন এ ধরনের ‘হটকারী’ আন্দোলনে সামিল হতে। কিন্তু দলীয় সভাপতির নির্দেশেই তাঁরা পথে নামেন।

ভিডিও গ্যালারী

  ত্রিপুরা ফোকাস  । © সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ত্রিপুরা ফোকাস ২০১০ - ২০১৭

সম্পাদক : শঙ্খ সেনগুপ্ত । প্রকাশক : রুমা সেনগুপ্ত

ক্যান্টনমেন্ট রোড, পশ্চিম ভাটি অভয়নগর, আগরতলা- ৭৯৯০০১, ত্রিপুরা, ইন্ডিয়া ।
ফোন: ০৩৮১-২৩২-৩৫৬৮ / ৯৪৩৬৯৯৩৫৬৮, ৯৪৩৬৫৮৩৯৭১ । ই-মেইল : This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.